২০২৬-২০৩০ সাল

ভোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনার লক্ষ্য চীনের

চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে দীর্ঘদিনের অস্থিতিশীলতা কাটাতে এবার বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তনের পথে হাঁটছে বেইজিং।

চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে দীর্ঘদিনের অস্থিতিশীলতা কাটাতে এবার বড় ধরনের কৌশলগত পরিবর্তনের পথে হাঁটছে বেইজিং। আগামী পাঁচ বছরের (২০২৬-২০৩০ সাল) জন্য স্থানীয় ভোগ বাড়াতে একগুচ্ছ নতুন নীতিমালা গ্রহণের পরিকল্পনা করছে দেশটির সরকার। মূলত সেবা খাতকে কেন্দ্র করে এ পরিকল্পনা সাজিয়েছে চীন। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো দেশটিতে সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে বিদ্যমান ভারসাম্যহীনতাকে দূর করা। দেশটির ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড রিফর্ম কমিশনের (এনডিআরসি) একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গতকাল এ পরিকল্পনার কথা জানান। খবর রয়টার্স।

চীনের নীতিনির্ধারকরা আগামী পাঁচ বছরে দেশটির অর্থনীতিতে ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ব্যয়ের হিস্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর অঙ্গীকার করেছেন। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এ লক্ষ্য পূরণ করা বেশ কঠিন হবে। কারণ মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তন এবং সরাসরি সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর পদক্ষেপ ছাড়া এ পরিকল্পনায় সফল হওয়া কঠিন।

এনডিআরসির উপপ্রধান ওয়াং চ্যাংলিন এক সংবাদ সম্মেলনে বর্তমান পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ‘বর্তমান অর্থনৈতিক কার্যক্রমে একটি বড় সমস্যা এখন সবার সামনে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। সেটি হলো বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও সে অনুযায়ী মানুষের চাহিদা অনেক কম।’

চীনের সরকারি হিসাব অনুযায়ী, গত বছর দেশটির অর্থনীতিতে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন হয়েছে। এটি বেইজিংয়ের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার সমান। মূলত রফতানি বাণিজ্যে বড় সাফল্যের কারণে এ প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হয়েছে। বিদেশের বাজারে রফতানি বাড়ায় অভ্যন্তরীণ বাজারে কেনাকাটা বা ভোগের যে ঘাটতি ছিল, তা পূরণ হয়ে গেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দীর্ঘমেয়াদে শুধু রফতানির ওপর নির্ভর করে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হবে।

২০২৫ সালের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান চীনের এ ভারসাম্যহীনতাকে আরো স্পষ্ট করে তুলেছে। ওই বছর দেশটিতে শিল্পোৎপাদন ৫ দশমিক ৯ শতাংশ বাড়লেও সাধারণ খুচরা পর্যায়ে বিক্রি বেড়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ কারখানাগুলোয় যে হারে পণ্য উৎপাদন হচ্ছে, দেশটির নাগরিক সে হারে পণ্য কিনছে না। বিশ্লেষকরা বলেন, ‘এ ব্যবধানই প্রমাণ করে, চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদার তুলনায় পণ্যের জোগান অনেক বেশি, যা অর্থনীতির জন্য একটি বড় সংকট।’

এ সংকট কাটাতে চীনের অর্থ মন্ত্রণালয় এখন নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে দেশটির উপ-অর্থমন্ত্রী লিয়াও মিন জানিয়েছেন, চলতি বছর জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে এবং কেনাকাটায় উৎসাহ দিতে সরকার আগের চেয়ে বেশি অর্থ খরচ করবে। তবে এ খাতে ঠিক কত টাকা বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেননি তিনি।

দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয় একই দিনে আরেকটি ঘোষণা দিয়েছে। ভোক্তা ঋণ সাশ্রয়ী করতে এবং মানুষের খরচ করার প্রবণতা বাড়াতে সরকার সুদে ভর্তুকি দেয়ার মেয়াদ ২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত বাড়িয়েছে। এ সুবিধার আওতায় সাধারণ ক্রেতা, সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসা আধুনিকায়নে আগ্রহী উদ্যোক্তারা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।

মন্ত্রণালয়টির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো ব্যক্তিগত ভোক্তা ঋণের খরচ কমিয়ে সাধারণ মানুষকে কেনাকাটায় উৎসাহিত করা।

পাশাপাশি বেসরকারি খাতের জন্যও বিশেষ সুবিধা নিশ্চিত করছে বেইজিং। ক্ষুদ্র ও মাঝারি বেসরকারি শিল্পের জন্য ইস্যু করা ঋণে আগামী দুই বছর পর্যন্ত সুদে ভর্তুকি দেয়া হবে। এছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে আগামী দুই বছর ৫০ হাজার কোটি ইউয়ান (৭ হাজার ১৮৩ কোটি ডলার) মূল্যের একটি গ্যারান্টি প্ল্যানও চালু করা হয়েছে।

চীনের সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, দেশটির সেবা খাতে প্রবৃদ্ধির বড় সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে বয়স্কদের সেবা, স্বাস্থ্যসেবা ও বিনোদনের মতো খাতগুলো এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। এনডিআরসির কর্মকর্তা ঝোউ চেন জানিয়েছেন, অভ্যন্তরীণ চাহিদা বাড়াতে সরকার এখন সেবা খাতকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

এতদিন পণ্য কেনাবেচার মাধ্যমে কেনাকাটা বাড়ানোর যে কৌশল ছিল, তার প্রভাব এখন ধীরে ধীরে কমে আসছে। তাই অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে চীন সরকার এখন পণ্য বিক্রির চেয়ে সেবা খাতের ওপরই বেশি ভরসা করছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

ফরাসি প্রতিষ্ঠান নাটিক্সিসের জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ গ্যারি এনজি জানান, অভ্যন্তরীণ চাহিদার বিকল্প হিসেবে চীন এখন আর শুধু রফতানির ওপর নির্ভর করতে পারবে না। এটি এখন আর বাস্তবসম্মতও নয়। চীনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল করার মূল চাবিকাঠি হবে সেবা খাত। নতুন এ নীতিমালাগুলো মার্চ বা এপ্রিলের মধ্যেই কার্যকর হতে শুরু করবে।

আরও